আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ইনসাফের বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন হাদি

নিজস্ব প্রতিবেদক: জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ের আলোচিত তরুণ রাজনীতিক, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র এবং আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদি (ওসমান হাদি) ইন্তেকাল করেছেন। রাজধানীর বিজয়নগরে দুর্বৃত্তদের গুলিতে গুরুতর আহত হওয়ার পর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
গত ১২ ডিসেম্বর ২০২৫, জুমার নামাজের পর দুপুর আনুমানিক ২টা ২৫ মিনিটে রাজধানীর পল্টনের বিজয়নগর বক্স কালভার্ট এলাকায় তিনটি মোটরসাইকেলে আসা অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা তার ওপর হামলা চালায়। হামলায় তার মাথায় গুলি লাগে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয় এবং পরে ওয়ান-স্টপ ইমার্জেন্সি সেন্টারে ভর্তি করা হয়। সে সময় তিনি গভীর কোমায় ছিলেন; তার জিসিএস স্কোর ছিল ৩।

অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় ১৫ ডিসেম্বর তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
বেড়ে ওঠা ও শিক্ষাজীবন
ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া ওসমান হাদির বাবা ছিলেন একজন মাদ্রাসা শিক্ষক ও স্থানীয় ইমাম। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। নলছিটির একটি মাদ্রাসায় তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা শেষে তিনি ঝালকাঠি এন এস কামিল মাদ্রাসা থেকে আলিম পাস করেন। পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। ঢাকায় থাকাকালে তিনি রামপুরা এলাকায় বসবাস করতেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও রাজনৈতিক উত্থান
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনে ওসমান হাদি ছিলেন সামনের সারির সংগঠক। রামপুরা এলাকার সমন্বয়ক হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। জুলাই শহিদদের অধিকার, ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী অবস্থান এবং ‘ন্যাশনাল অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট ইউনিটি’র ব্যানারে রাজপথে সক্রিয় ছিলেন তিনি।
এই অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতায় তিনি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ প্রতিষ্ঠা করেন। সংগঠনটির লক্ষ্য ছিল আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা।
নির্বাচনী ভাবনা ও রাজনৈতিক দর্শন
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন (মতিঝিল, শাহবাগ, রমনা, পল্টন ও শাহজাহানপুর) থেকে এমপি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দিয়েছিলেন হাদি। জনগণের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপনে তিনি ‘চা-সিঙ্গারা’ আড্ডার মতো ব্যতিক্রমী কর্মসূচির মাধ্যমে আলোচনায় আসেন।
তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাঠামোগত দুর্বলতার সমালোচনা করে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান করে একটি জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দেন। একই সঙ্গে বিএনপিসহ পুরোনো ধারার রাজনীতির কড়া সমালোচক ছিলেন তিনি। তার মতে, পুরোনো রাজনীতির ধারায় ক্ষমতায় এলে টেকসই পরিবর্তন সম্ভব নয়।
হুমকি ও হামলার অভিযোগ
হাদি জীবদ্দশায় একাধিকবার হত্যার হুমকি পাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। তার দাবি, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের পক্ষ থেকে ফোনকল ও বার্তার মাধ্যমে তাকে এবং তার পরিবারকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল। এমনকি তার বাড়িতে আগুন দেওয়া এবং পরিবারের নারী সদস্যদের ক্ষতির হুমকির কথাও তিনি উল্লেখ করেছিলেন।
এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত হিসেবে ফয়সাল করিম মাসুদ (দাউদ খান) এবং আলমগীর হোসেনকে শনাক্ত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
ব্যক্তিগত জীবন
ব্যক্তিগত জীবনে ওসমান হাদি বিবাহিত ছিলেন এবং এক সন্তানের জনক। তার অকাল মৃত্যুতে রাজনৈতিক অঙ্গনসহ অনুসারী ও শুভানুধ্যায়ীদের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।



